মোবাইল নেটওয়ার্ক যেখানে ঠিকমতো পৌঁছায় না, যাতায়াতের একমাত্র পথ যেখানে নদী, সেই ছোট্ট গ্রামের একমাত্র মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজের একটি শ্রেণিকক্ষেই ১ অক্টোবর খুলে গিয়েছিল মহাবিশ্বের এক বিশাল জানালা।
সন্ধ্যা নদীর ঠিক তীরে, শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে অবস্থিত ‘মসজিদবাড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ’-এ সফলভাবে অনুষ্ঠিত হলো ‘অ্যাস্ট্রোস্কুল বাংলাদেশ’-এর আরেকটি আয়োজন। ক্লাস ৮ থেকে ১০-এর ৭৭ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে সকাল ১১টা থেকে শুরু হয় দিনব্যাপী এই বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক আয়োজন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই অনলাইনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হন ন্যাশনাল আউটরিচ কোঅর্ডিনেটর—বাংলাদেশ (NOC-BD), বুয়েটের ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী। তাঁর আইসব্রেকিং সেশনে শিক্ষার্থীরা জানতে পারে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা (IAU) ও নকবিডি (NOCBD)-এর কার্যক্রম এবং দৈনন্দিন জীবনে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে।
এরপর অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম ফিরোজের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এবং দাতা সদস্য সাইফুল ইসলাম রাহাদের উৎসাহমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হয় মূল আয়োজন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি, অবসরপ্রাপ্ত কাস্টমস সচিব আলী আহমদ এবং বর্তমান সভাপতি, অবসরপ্রাপ্ত সংসদ সচিব মো. নুরুজ্জামান।
এটি ছিল বিদ্যালয়টির প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক আউটরিচ কার্যক্রম। ফলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকসহ উপস্থিত সবার মধ্যেই ছিল ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ।
নকবিডি অ্যালামনাই আল মাহমুদ-এর ‘সৌরজগৎ’ সেশনের মাধ্যমে শুরু হয় মূল শেখার পর্ব। সৌরজগতের পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের বোঝান—নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হওয়া মৌলগুলো কীভাবে শেষ পর্যন্ত আমাদের শরীর ও পৃথিবীর উপাদানের অংশ হয়ে উঠেছে। মহাবিশ্বের সঙ্গে নিজেদের অস্তিত্বের এই যোগসূত্র শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
এরপর নকবিডি ভলান্টিয়ার Muhammad Minhaz-এর পরিচালনায় শিক্ষার্থীরা তৈরি করে ‘পকেট সৌরজগৎ’, যেখানে কাগজ-কলমে সৌরজগতের প্রকৃত রূপ যেন বাস্তব হয়ে ওঠে তাদের হাতের মুঠোয়।
এরপর নকবিডি ভলান্টিয়ার ফারিবা নেহরীন বিন্তি-র ‘মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান’ সেশন এবং অনয় তালুকদার-এর ‘মহাবিশ্বের পরিসর’ হাতে-কলমে কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মহাবিশ্বের বিশালতা ও তাতে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারে।
পুরো আয়োজনজুড়ে প্রতিটি হাতে-কলমে কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে সরাসরি কাজগুলো বুঝিয়ে দেন নকবিডি ভলান্টিয়ার লাবনী আক্তার সেতু। তাঁর সক্রিয় সহযোগিতায় শিক্ষার্থীরা প্রতিটি কার্যক্রম আরও সহজে বুঝতে ও অংশ নিতে পারে।
দিনের শেষ ভাগে নকবিডি ভলান্টিয়ার আলী নেওয়াজ-এর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয় সূর্যঘড়ি তৈরি ও টেলিস্কোপের মাধ্যমে সূর্য পর্যবেক্ষণ। পুরো আয়োজনজুড়েই অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্যও সূর্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ উন্মুক্ত ছিল।
শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি যাচাইয়ে প্রি-ইভ্যালুয়েশন ও পোস্ট-ইভ্যালুয়েশন পরিচালনা করা হয়। শেষে কুইজের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের সনদ ও পুরস্কার এবং অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম ফিরোজ, বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষক পঙ্কজ বিশ্বাস, অফিস সেক্রেটারি মো. সাইফুল ইসলাম ও দাতা সদস্য সাইফুল ইসলাম রাহাদকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। বিদ্যালয়ের লাইব্রেরির জন্য অধ্যাপক ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর দুটি বইও প্রদান করা হয়।

নদীর তীরে অবস্থিত এই ছোট্ট স্কুলে সেদিন একটি টেলিস্কোপ, কিছু হাতে-কলমে কার্যক্রম আর মহাবিশ্বকে জানার অদম্য কৌতূহল মিলিয়ে খুলে গিয়েছিল মহাকাশের এক নতুন জানালা।
অ্যাস্ট্রোস্কুল বাংলাদেশের লক্ষ্য—শহরের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছেও বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানকে পৌঁছে দেওয়া।
আজ নদীর তীরে এই ছোট্ট স্কুল, আগামীতে হয়তো আপনার স্কুলের আকাশেও উঠবে মহাবিশ্বের সেই জানালা।

